এম,এ রাশেদ,স্টাফ রিপোর্টারঃ বগুড়ার ধুনট উপজেলার চিকাশী ইউনিয়নের ছোনপচা গ্রামে মাজার নির্মাণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। সোমবার (২২ জুন ২০২৬) দুপুরে এ বিষয়ে অনুষ্ঠিত ধর্মীয় আলোচনা সভায় কোরআন ও হাদিস অবমাননার অভিযোগ ওঠার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে স্থানীয় তৌহিদী জনতা প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে ছোনপচা গ্রামের পূর্ব-দক্ষিণ পাড়ার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম মারা যান। তার অনুসারীরা তাকে পীর হিসেবে দাবি করে আসছেন। মৃত্যুর পর তার ছেলে জাকারিয়া, আত্মীয়-স্বজন ও ভক্তরা সেখানে একটি মাজার নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তবে স্থানীয় আলেম সমাজের আপত্তির মুখে বিষয়টি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়।
সম্প্রতি জাকারিয়া ও তার অনুসারীরা দাবি করেন, তারা স্বপ্নে মৃত শহিদুল ইসলামের কাছ থেকে মাজার নির্মাণের নির্দেশ পেয়েছেন। এ দাবির পর নতুন করে মাজার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম এর বিরোধিতা করেন। তাদের দাবি, শরিয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের মাজার নির্মাণের বৈধতা নেই। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ তীব্র আকার ধারণ করলে ধর্মীয় আলোচনা বা বাহাছের আয়োজন করা হয়।
পরিস্থিতি শান্ত রাখতে চিকাশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন জুয়েলের উদ্যোগে উভয় পক্ষকে নিয়ে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জোরশিমুল জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুস সবুরের পক্ষ এবং জাকারিয়ার পক্ষ থেকে পাঁচজন করে আলেম অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে ছোনপচা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে প্রায় দুই শতাধিক মানুষের সমাগম ঘটে।
দুপুর ২টা থেকে শুরু হওয়া আলোচনা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চললেও কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, একপর্যায়ে বাহাছের জন্য আনা কোরআন শরিফ ও হাদিসের কিতাব নিয়ে কথোপকথনের সময় আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়। এতে উপস্থিত জনতার মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলোচনা সভা স্থগিত ঘোষণা করেন।
পরে স্থানীয় তৌহিদী জনতা জোরশিমুল বাজারে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিল শেষে বাজারের যাত্রী ছাউনিতে অনুষ্ঠিত সমাবেশে স্থানীয় ও বিভিন্ন এলাকার আলেমরা বক্তব্য দেন এবং কোরআন-হাদিস অবমাননার অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানান।
জোরশিমুল জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুস সবুর বলেন, “তারা দীর্ঘদিন ধরে মাজার ও ওরসের নামে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সর্বশেষ স্বপ্নে নির্দেশ পাওয়ার কথা বলে মাজার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাহাছ চলাকালে কোরআন ও হাদিসের অবমাননা করা হয়েছে, যা মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জাকারিয়া বলেন, “মাজার নির্মাণ নিয়ে কুফরি, শিরক ও গাঁজার আসরের যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কোরআন অবমাননার অভিযোগও ইচ্ছাকৃত নয়, অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন ঘটনা ঘটেছে।”
চিকাশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন জুয়েল বলেন, “উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় আলোচনা বন্ধ করে দিতে হয়েছে।”
কোরআন অবমাননার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ভিডিও ফুটেজে যেটি দেখা যাচ্ছে, সেটি হয়তো বক্তব্য প্রদানের সময় ‘স্লিপ অব টাং’ বা অনিচ্ছাকৃত শব্দচয়ন হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “মাজারকে কেন্দ্র করে কুফরি, শিরক কিংবা গাঁজার আসরের যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি নিজেও তরিকতপন্থী। একটি পক্ষ ও কিছু জামায়াতপন্থী আলেম বিষয়টি নিয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।”
এ বিষয়ে ধুনট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ আতিকুল ইসলাম জানান “বিষয়টি সম্পর্কে আগে অবগত ছিলাম না। আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পরিস্থিতি যাতে আরও অবনতির দিকে না যায়, সে জন্য প্রশাসনের নিবিড় নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ মিন্টু ইসলাম
Mintuislam59@gmail.com
ইপেপার