এম,এ রাশেদ,স্টাফ রিপোর্টারঃ উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ সবজির মোকাম ও কৃষিপণ্যের পাইকারি কেন্দ্র বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থান হাটে কাঁচা মরিচের দাম হঠাৎ করেই ব্যাপকভাবে কমে গেছে। কয়েকদিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে কাঁচা মরিচের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় স্বস্তি ফিরেছে খুচরা ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তাদের মাঝে। তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই দরপতনে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় মরিচ চাষিরা।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন ২০২৬) সকাল ১০টার দিকে মহাস্থান হাট ঘুরে দেখা যায়, পাইকারি পর্যায়ে ভালো মানের কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ মাত্র এক সপ্তাহ আগেও একই মানের মরিচের দাম ছিল এর প্রায় দ্বিগুণ। ব্যবসায়ীদের মতে, বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়াই এই আকস্মিক মূল্যপতনের প্রধান কারণ।
আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, গত কয়েকদিন ধরে মহাস্থান হাটে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কাঁচা মরিচ আমদানি হচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মরিচ আসায় বাজারে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হয়ে গেছে। ফলে ক্রেতাদের আগ্রহ থাকলেও অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দাম ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
মহাস্থান হাটের এক আড়তদার বলেন,
"গত সপ্তাহে সরবরাহ কম থাকায় মরিচের দাম অনেক বেশি ছিল। কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানে বৃষ্টির কারণে মাঠের মরিচ একসঙ্গে বাজারে চলে এসেছে। এতে হাটজুড়ে মরিচের স্তূপ জমে গেছে। সরবরাহ বেশি হওয়ায় আগের মতো দাম পাওয়া যাচ্ছে না।"
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, দেশের বিভিন্ন বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত কাঁচা মরিচ বাজারে প্রবেশ করায় স্থানীয় বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে পাইকারি বাজারে মূল্য কমার প্রবণতা আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।
অন্যদিকে, দাম কমে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন বগুড়ার শিবগঞ্জ, মহাস্থান, মোকামতলা ও আশপাশের এলাকার মরিচ চাষিরা। কৃষকদের দাবি, সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বর্তমান বাজারদরে মরিচ বিক্রি করে অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদন খরচ উঠে আসছে না।
মহাস্থানের পাশের মোকামতলা হরিপুর গ্রামের মরিচ চাষি আব্দুল জব্বার বলেন,
"গত সপ্তাহেও ভালো দামে মরিচ বিক্রি করেছি। আজ দুই মণ মরিচ নিয়ে হাটে এসে দেখি প্রতি কেজিতে প্রায় অর্ধেক দাম কমে গেছে। মরিচ তোলা, পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ দেওয়ার পর হাতে তেমন কিছুই থাকছে না। এভাবে দাম আরও কমতে থাকলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে।"
পাইকারি বাজারে দরপতনের প্রভাব ইতোমধ্যে খুচরা বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। বগুড়া শহরের রাজাবাজার, ফতেহ আলী বাজার ও চেলোপাড়া বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েকদিন আগেও যেখানে একই পণ্যের দাম ছিল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।
খুচরা ক্রেতারা জানান, কাঁচা মরিচের উচ্চমূল্যের কারণে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রান্নাঘরের বাজেটে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছিল। দাম কমে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুমি উৎপাদন বৃদ্ধি, অনুকূল আবহাওয়া এবং আমদানি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক সপ্তাহ বাজারে কাঁচা মরিচের দাম স্থিতিশীল থাকতে পারে। তবে অতিবৃষ্টি, বন্যা কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে পরিস্থিতি আবারও পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পণ্যের দাম ধরে রাখতে উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন কৃষক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবেন, অন্যদিকে ভোক্তারাও সহনীয় মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের সুযোগ পাবেন।
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ মিন্টু ইসলাম
Mintuislam59@gmail.com
ইপেপার