
এমন মানুষদের নিয়ে লিখতে গেলে কলম যেন আপনা আপনি নরম হয়ে আসে। শোকরানা মামা শুধু একটি পরিচয় নয়, বরং এক অবিনশ্বর অধ্যায়। তিনি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, হোটেল নাজ গার্ডেনের প্রতিষ্ঠাতা। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা; যিনি মুক্তির পতাকাকে রক্তে রাঙিয়ে এনেছেন, আর জীবনের প্রতিটি প্রান্তে দেশপ্রেমকে অটুট রেখেছেন। ব্যবসার জগতে তিনি ছিলেন দূরদর্শী, সাহসী এবং নৈতিকতার এক অনন্য উদাহরণ।
অনেকদিন আগের কথা, বগুড়ায় একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম তৈরি করা হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। শুরু হয়ে গেল চিঠি চালাচালি। যেহেতু বিএনপি ক্ষমতায় তাই স্টেডিয়ামের নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে গেল।
এটি না হয় হল কিন্তু আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে খেলায় অংশগ্রহণকারী আন্তর্জাতিক মানের খেলাোয়ারগণ খেলা চলাকালীন সময়ে অবস্থান করবেন কোথায়? খেলোয়ারদের থাকার জন্য দরকার একটি আধুনিক হোটেল। বাট সে হোটেলটি নির্মাণ কিভাবে হবে? এই হোটেল তৈরির প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণকারী ইন্ডিয়ার দেরাদুনে ট্রেনিংপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা কাম ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শোকরানা। তিনি নির্মাণ করলেন ফোরস্টার 'নাজ গার্ডেন'। ভুলে গেলে চলবে না তিনি বিএনপির জন্য অনেক করেছেন এবং বিএনপি করার অপরাধে তাকে অনেক ভোগান্তিও পোহাতে হয়েছে, সেটা ভুলবার নয়।
আবার ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অগণিত মানুষের ভরসা, আশ্রয় আর ভালোবাসার এক অবলম্বন।
সম্প্রতি তিনি জীবনের আরেকটি বড় লড়াই লড়েছেন- রক্তক্ষয়ী যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বরং হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের মতো জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়ার পর চিকিৎসকরা দীর্ঘ দুই মাস তাঁকে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। মহান রাব্বুল আলামীনের অসীম রহমতে তিনি এখন সুস্থ হয়ে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরেছেন। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শে এখনও তাঁকে জনসমাগম থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে- প্রায় তিন মাস এমন নিভৃত জীবনে থাকতে হবে, যা হয়তো তাঁর মতো মানুষের জন্য কঠিন, যিনি সবসময় মানুষের ভিড়ে, আড্ডায় আর বন্ধুত্বে প্রাণ পান।
আমার নিজেরও আফসোস ছিল, প্রিয় মামার দেশে ফেরার পরও ব্যস্ততার কারণে তাঁর সাথে দেখা করার সুযোগ হয়ে উঠেনি। অবশেষে গত সোমবার রাতে গেলাম নাজ গার্ডেন, যেখানে তাঁর স্নিগ্ধ হাসি আর পরিচিত আন্তরিকতায় ভরা চোখ আমাকে স্বাগত জানাল। ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় মনে হচ্ছিল, এই মানুষটির মাঝে শক্তি আর ভালোবাসার এমন এক মিশ্রণ আছে, যা কাছে গেলে আপনাকে আবেগে ভরিয়ে দেয়। কথা বলতে বলতে বুঝলাম, বড় অপারেশনের ধকল থাকলেও তাঁর মনোবল এখনো আগের মতোই অটুট। দেশ, মানুষ আর ব্যবসা—সবকিছু নিয়েই তিনি এখনো ভাবেন, পরিকল্পনা করেন, স্বপ্ন দেখেন।
শোকরানা মামা শুধু আমার মামা নন, তিনি আমার অনুপ্রেরণা। তাঁর জীবন আমাকে শিখিয়েছে, সাফল্যের জন্য দরকার পরিশ্রম আর সততা, আর জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় জয় পেতে দরকার দৃঢ় মনোবল ও ঈমানী শক্তি। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে জীবনের যেকোনো সঙ্কট, সব জায়গায় একজন মুক্তিযোদ্ধা কখনো হার মানেন না। আজ তাঁর এই সুস্থতা আমার জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি কৃতজ্ঞতারও বিষয়। মহান আল্লাহ তাঁর জন্য সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও শান্তিময় জীবন দান করুন- এই দোয়া করি হৃদয়ের গভীর থেকে।
যখন নাজ গার্ডেনের তৃতীয় তলায় তার বাসভবনের আঙিনার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বিদায় নিলাম, মনে হচ্ছিল- এই আঙিনা যেমন মামার স্বপ্নের প্রতীক, তেমনি তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের শেখায়, কীভাবে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হয়, আর মানুষের ভালোবাসায় বেঁচে থাকতে হয়। শোকরানা মামা, আপনি শুধু কোনো গণ্ডির নয়; এই শহরের এক প্রেরণার বাতিঘর।
#Bangladesh
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ মিন্টু ইসলাম
Mintuislam59@gmail.com
ইপেপার