সম্পাদকীয়....
মিন্টু ইসলাম, সম্পাদক ও প্রকাশক "দৈনিক প্রাণের শহর বিডি।
আমি নিতান্তই একজন সাধারণ মানুষ। একজন ক্ষুদ্র সাংবাদিক হিসেবে কেউ কেউ হয়তো আমাকে চেনেন। সাংবাদিকতার সুবাদে দেশের নানা ঘটনা নিয়ে লিখি, মানুষের কথা বলার চেষ্টা করি। আজ কোনো দল বা ব্যক্তির পক্ষে-বিপক্ষে নয়, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে কিছু কথা বলতে চাই।
আমার চাওয়া একটাই—বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ থাকুক, মানুষের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক এবং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মব বা সংঘবদ্ধ জনতার মাধ্যমে বিভিন্ন স্থাপনা, ক্লিনিক, বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কয়েকটি ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে এবং তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আমি মনে করি, কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে থাকলে তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু সেই বিচার আইনের মাধ্যমে হতে হবে। কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই একটি দল বা জনসমষ্টি যদি নিজেরাই বিচারক, তদন্তকারী ও শাস্তিদাতা হয়ে যায়, তাহলে সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আমরা ভুলে যেতে পারি না—২০২৪ সালের গণআন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দেশের আপামর মানুষের অংশগ্রহণে সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। তৎকালীন সরকারের পতনের পর বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি, মন্ত্রী ও নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছিল। তখন দেশে নির্বাচিত সরকার না থাকায় পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অস্থির।
কিন্তু সেই সময়ের ঘটনাকে ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের জনতার আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বৈধতা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
কারণ আজ যার বাড়িতে হামলা হচ্ছে, কাল হয়তো অন্য কারও বাড়িতে হবে। আজ যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর হচ্ছে, কাল একই ঘটনা একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। রাজনৈতিক পরিচয়, পেশা, মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ—কোনোটিই কাউকে আইনের বাইরে রাখার কারণ হতে পারে না।
আমার প্রশ্ন খুব সাধারণ—আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে অভিযোগ উঠলেই শত শত মানুষ গিয়ে কোনো বাড়ি, প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনা ভেঙে ফেলবে? নাকি আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে অভিযোগের তদন্ত হবে, প্রমাণ যাচাই হবে এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার হবে?
আমি দ্বিতীয় পথটিই চাই।
একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি মনে করি, সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হলো ঘটনা তুলে ধরা—কাউকে উত্তেজিত করা নয়। সাংবাদিকদেরও যাচাই ছাড়া কোনো অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও কোনো গুজব, ভিডিও বা পোস্ট দেখে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি।
রাষ্ট্রের কাছেও আমার অনুরোধ—যে-ই অপরাধ করুক, তার রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনা হোক। কোনো ঘটনার তদন্ত হলে তা যেন স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয় এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক মব-সহিংসতা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানও উঠে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে মব সহিংসতায় অন্তত ১৫৪ জন নিহত হয়েছেন। এমন পরিসংখ্যান আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে—আইনের বাইরে গিয়ে জনতার হাতে বিচার করার প্রবণতা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
আমরা একটি শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ চাই। এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, প্রতিবাদ থাকবে, আন্দোলন থাকবে—কিন্তু মানুষের বাড়িঘর, ব্যবসা, কর্মস্থল, চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা গণমাধ্যমের প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করে নয়।
আমার বিশ্বাস, ২০২৪ সালের আন্দোলনের অন্যতম শিক্ষা হওয়া উচিত—মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা। সেই অধিকার সবার জন্য সমান হওয়া প্রয়োজন।
মব সন্ত্রাস কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আইনের শাসনই হতে পারে একটি শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের ভিত্তি।
আমি কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে এই কথা বলছি না।
আমি বলছি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে।
আমি বলছি একজন ক্ষুদ্র সাংবাদিক হিসেবে।
আমি বলছি একজন বাংলাদেশি হিসেবে।
বাংলাদেশ শান্তিময় হোক।
মানুষ নিরাপদে থাকুক।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।
অপরাধীর বিচার হোক—কিন্তু বিচার হোক আইনের মাধ্যমে।
মিন্টু ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক প্রাণের শহর বিডি
www.pranershohorbd.net
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ মিন্টু ইসলাম
Mintuislam59@gmail.com
ইপেপার