এম.এ রাশেদ,স্টাফ রিপোর্টারঃ প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বগুড়ার ধুনট উপজেলার জনজীবন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য কোনো সময়সূচি না থাকায় কখন বিদ্যুৎ যাবে, কখন আসবে-তা নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামীণ এলাকার মানুষ। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে বাসাবাড়ির স্বাভাবিক কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষিকাজ ও বিভিন্ন খামারের উৎপাদন। একই সঙ্গে ফ্রিল্যান্সিংসহ অনলাইনভিত্তিক পেশায় যুক্ত ব্যক্তিরাও পড়ছেন আর্থিক ক্ষতির মুখে।
ধুনট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন ১০টি উপজেলা ও পৌরসভার ২২১টি গ্রামের প্রায় ৯৪ হাজার ১০ জন গ্রাহক রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ২০ থেকে ২৫ মেগাওয়াটের মধ্যে থাকলেও অনেক সময় চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন এলাকায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ধুনটে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৫ মেগাওয়াট। ওই সময় সরবরাহ পাওয়া যায় মাত্র ৮ মেগাওয়াট। চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ব্যবধানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিদ্যুৎ সংকটের তীব্রতা।
নেই নির্ভরযোগ্য লোডশেডিং সূচি
গ্রাহকদের অভিযোগ, কখন কোন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে, সে বিষয়ে কার্যকর কোনো সময়সূচি মানা হচ্ছে না। ফলে জরুরি কাজ থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পড়াশোনার পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর কখন তা ফিরবে, সে তথ্য জানতেও অনেক সময় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে গ্রাহকদের।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, জরুরি সেবা নম্বর কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায় না। ফলে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
কালেরপাড়া এলাকার বাসিন্দা লিখন মণ্ডল বলেন, রাতের লোডশেডিংয়ে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, গতকাল রাত ৪টার দিকে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর সকাল ১০টার দিকে তা ফিরে আসে। প্রচণ্ড গরমে টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় পরিবারের শিশু ও বয়স্ক সদস্যরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
পড়াশোনা ও ব্যবসায় ধাক্কা
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। অনেক পরিবারের জেনারেটর, আইপিএস কিংবা বিকল্প আলোর ব্যবস্থা না থাকায় রাতের পড়াশোনা কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পরীক্ষার্থী ও অনলাইনভিত্তিক শিক্ষায় যুক্ত শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও। স্টুডিও, স্টেশনারি দোকান, রেস্তোরাঁ, লাইব্রেরি, চালকলসহ ছোট ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন খামারেও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির প্রভাব পড়ছে। ফলে লোডশেডিং এখন শুধু আলো-বাতির সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে মানুষের আয়-রোজগার ও স্থানীয় অর্থনীতির বিষয়টিও।
চৌকিবাড়ী, মথুরাপুর ও গোপালনগর ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানান, এসব এলাকায় বিশেষ করে রাতের দিকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি বেশি খারাপ। অনেক সময় দুই ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ এলেও ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই আবার চলে যায়। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ফ্রিল্যান্সারদের আয়-রোজগারে প্রভাব
মথুরাপুর এলাকায় ১৫টি আইটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২০০ ফ্রিল্যান্সার নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সমস্যায় পড়েছেন। বিদেশি ক্লায়েন্টদের সঙ্গে অনলাইনে কাজ করা এসব পেশাজীবীর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মথুরাপুরের ফ্রিল্যান্সার মো. কামরুল ইসলাম বলেন, লোডশেডিং তাঁদের জন্য শুধু দৈনন্দিন ভোগান্তি নয়, সরাসরি আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ জমা দিতে না পারলে বিদেশি ক্লায়েন্ট হারানো, অর্ডার বাতিল হওয়া এমনকি অর্থ ফেরত দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
খামারেও বাড়ছে লোকসানের আশঙ্কা
বিদ্যুৎ সংকটে বিপাকে পড়েছেন পোলট্রি খামারিরাও। চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের পাঁচথুপী গ্রামের খামারি আবু তালেব বলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মুরগির খামারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে তাঁর কয়েকটি মুরগি মারা গেছে।
চিকাশী, কালেরপাড়া ও ভান্ডারবাড়ী এলাকার খামারিরাও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়বে।
গোসাইবাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী গোলাম রাব্বানী বলেন, গত এক সপ্তাহে এলাকায় লোডশেডিং উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কখনো মাত্র ১০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকার পর এক ঘণ্টা পর্যন্ত সরবরাহ বন্ধ থাকছে। রাতের পরিস্থিতি আরও খারাপ। এর প্রভাব পরদিন মানুষের কর্মজীবনেও পড়ছে।
বিদ্যুৎ অফিসে গ্রাহকদের ক্ষোভ
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ নিয়ে ধুনট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয়ে প্রতিদিনই গ্রাহকদের ভিড় বাড়ছে। একের পর এক গ্রাহক কর্মকর্তাদের কাছে তাঁদের ভোগান্তি ও ক্ষোভের কথা জানাচ্ছেন। এতে বিদ্যুৎ সংকটের তীব্রতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে ধুনট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম মো. কামাল পাশার কাছে জানতে চাইলে তিনি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সংকট শুধু ধুনটে নয়, সারা দেশেই রয়েছে। মানুষ ফোন করে এবং অফিসে এসে তাঁদের ভোগান্তির কথা জানাচ্ছেন।
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৭১টি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। কোনো কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছে। জাতীয় পর্যায়ের এই সংকটের প্রভাব ধুনটের মতো মফস্বল এলাকাতেও পড়েছে। জাতীয় পর্যায়ে পরিস্থিতির উন্নতি হলে ধুনটেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে তিনি জানান।
‘গ্রামেই কেন বেশি লোডশেডিং?’
কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জাতীয় বিদ্যুৎ সংকটকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এতে সন্তুষ্ট নন ধুনটের গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দারা। তাঁদের প্রশ্ন, বিদ্যুৎ সংকট যদি সার্বিক হয়, তাহলে পৌর এলাকায় তুলনামূলকভাবে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও গ্রামাঞ্চলে কেন ঘন ঘন এবং দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে?
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বিদ্যুৎ সংকট যত দিনই থাকুক, অন্তত এলাকাভিত্তিক একটি নির্ভরযোগ্য লোডশেডিং সূচি প্রকাশ করা হোক। এতে মানুষ তাঁদের দৈনন্দিন কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষার সময় কিছুটা হলেও পরিকল্পনা করে নিতে পারবেন।
তাঁরা দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি, এলাকাভিত্তিক ন্যায্য বণ্টন এবং গ্রাহকদের নিয়মিত তথ্য জানানোর ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের মতে, বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি অনিশ্চিত সরবরাহ ও তথ্যের ঘাটতিই তাঁদের দুর্ভোগকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ধুনটের গ্রাহকদের জন্য স্বচ্ছ ও কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

