দৈনিক প্রাণের শহর বিডি ডেস্ক:
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব ফিফা বিশ্বকাপ। সেই মহোৎসবের উদ্বোধনী মঞ্চে এবার সরাসরি উড়েছে বাংলাদেশের লাল-সবুজের গৌরব। মাঠে বাংলাদেশের কোনো দল না থাকলেও,বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের সামনে দেশের সংস্কৃতি,ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয় তুলে ধরেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সংগীতশিল্পী,মিউজিক প্রডিউসার ও ডিজে সঞ্জয় দেব।
কানাডার টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে আয়োজিত বিশ্বকাপের বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক তারকাদের সঙ্গে পারফর্ম করেন সঞ্জয় দেব। ফিফার উদ্যোগে নির্মিত অফিসিয়াল গান ‘সির সির’ পরিবেশন করেন তিনি,সঙ্গে ছিলেন কানাডিয়ান শিল্পী নোরা ফাতেহি ও ফরাসি র্যাপ তারকা ভেজেড্রিম। প্রাণবন্ত সংগীত,আধুনিক মঞ্চায়ন ও দৃষ্টিনন্দন পরিবেশনায় মুহূর্তেই উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে পুরো স্টেডিয়ামে।
তবে সেদিন শুধু তাঁর গান নয়,বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল তাঁর পোশাকও। বিশেষভাবে নির্মিত জ্যাকেটজুড়ে স্থান পেয়েছিল বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের নানা প্রতীক। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গর্জন, জাতীয় ফুল শাপলার সৌন্দর্য এবং লাল-সবুজ পতাকার আবেগ যেন শিল্পিত রূপে ফুটে উঠেছিল সেই পোশাকে। পারফরম্যান্স চলাকালে তিনি বারবার এসব প্রতীকের দিকে ইঙ্গিত করে বিশ্বদর্শকের সামনে তুলে ধরেছেন নিজের শেকড়,নিজের বাংলাদেশকে। এটি ছিল কেবল একটি ফ্যাশন উপস্থাপনা নয়,বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও জাতীয় গৌরবের এক অনন্য প্রকাশ।
এই ব্যতিক্রমী কস্টিউমের নকশা করেন ছায়া কুমার। সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারির কাজ করেন জন কিম এবং পুরো স্টাইলিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন জেসমিন প্যাটেল। তাদের সম্মিলিত সৃজনশীলতায় পোশাকটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের পরিচয়ের এক জীবন্ত প্রতীক।
সঞ্জয় দেবের শিকড় বাংলাদেশের মাটিতেই প্রোথিত। ১৯৯১ সালের ১৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবা সন্তোষ দেব এবং মা মিতা দেব। তিনি সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাছননগরের বিশিষ্ট চিকিৎসক প্রয়াত ডা. ধীরেন্দ্রনাথ দেব চৌধুরীর নাতি। সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মায়ের কাছ থেকেই ছোটবেলায় সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ জন্মেছিল তাঁর। পরবর্তীতে পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমালেও জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা কখনো ম্লান হয়নি।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোসেতে বেড়ে ওঠা সঞ্জয় এভারগ্রিন ভ্যালি হাই স্কুল,ডি আনজা কলেজ এবং সান জোসে স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। ব্যবসায় শিক্ষায় স্নাতক হলেও তাঁর প্রকৃত ভালোবাসা ছিল সংগীত ও সাউন্ড প্রোডাকশন। সেই ভালোবাসাকেই পুঁজি করে তিনি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
বর্তমানে লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক ইলেকট্রনিক মিউজিক প্রডিউসার হিসেবে তিনি সুপরিচিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘Shangri-La’, যা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংগীত চার্টে স্থান করে নেয়। এছাড়া Elliott Yamin-এর সঙ্গে ‘Iewf (Obvi)’, দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ড GOT7-এর সদস্য Mark Tuan-এর সঙ্গে ‘One in a Million’ এবং Guru Randhawa-এর অ্যালবাম ‘Man of the Moon’-এর একাধিক গানের রচয়িতা ও প্রযোজক হিসেবেও তিনি প্রশংসা অর্জন করেছেন।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে প্রকাশিত ‘সির সির’ গানটিও বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। মরক্কোতে ধারণ করা গানটির ভিডিও প্রকাশের পর অল্প সময়েই কোটি কোটি দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়। বিশ্বের নানা দেশের ফুটবলপ্রেমীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গানটির প্রশংসা করেছেন।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে দাঁড়িয়ে সঞ্জয় দেব নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন,একজন অভিবাসীর সন্তান হিসেবে ঘরের ছোট্ট স্টুডিও থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পৌঁছানো তাঁর জন্য অবিশ্বাস্য এক অভিজ্ঞতা। তাঁর মতে,এটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দুই সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠা অসংখ্য স্বপ্নবাজ তরুণের প্রতিনিধিত্ব।
সঞ্জয়ের এই অর্জনে উচ্ছ্বসিত বাংলাদেশ,বিশেষ করে সুনামগঞ্জ,শ্রীমঙ্গল ও সমগ্র সিলেট অঞ্চল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ অভিনন্দন জানিয়েছেন তাঁকে। অনেকে আবেগভরে লিখেছেন, “মিতুর ছেলে সঞ্জয়,বাংলাদেশের বিশ্বজয়।” শিল্পী, সাহিত্যিক,সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীরাও তাঁর সাফল্যে গর্ব প্রকাশ করেছেন।
সঞ্জয় দেব প্রমাণ করেছেন,নাগরিকত্ব বদলালেও শেকড়ের পরিচয় বদলায় না। তিনি দেখিয়েছেন, পৃথিবীর যেখানেই বসবাস করা হোক,হৃদয়ে যদি জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা থাকে,তবে বিশ্বমঞ্চেও নিজের দেশকে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরা সম্ভব। বিশ্বকাপের ঝলমলে আলোয় তাঁর কণ্ঠে যেমন ছিল সংগীতের শক্তি,তেমনি তাঁর উপস্থিতিজুড়ে ছিল বাংলাদেশের গল্প,বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।
সত্যিই,সঞ্জয় দেব শুধু একজন সফল শিল্পীর নাম নন; তিনি আজ বিশ্বদরবারে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা বাংলাদেশের এক গর্বিত মুখ।

