ফরিদপুর প্রতিনিধি: ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘদিন অসুস্থতায় ভোগার একপর্যায়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন বীথি আক্তার (নামটি পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী)। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন তাঁর স্বজনেরা। অন্যদিকে, ঘটনা তদন্তে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বীথি আক্তারের মৃত্যু হয়। তিনি রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলার হাট জ্যোতিনবর্দীপাড়া গ্রামের রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী। তিনি ফরিদপুর শহরের একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কাজ করতেন।
অস্ত্রোপচারের পর শুরু হয় শারীরিক জটিলতা
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বীথি আক্তারের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। অস্ত্রোপচারের পাঁচ দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে স্বামীর বাড়িতে চলে যান তিনি।
এরপর থেকেই তাঁর শারীরিক বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও গুরুতর কোনো সমস্যা নেই বলে তাঁকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে প্রায় দেড় মাস পর দুটি বেসরকারি হাসপাতালে দুই দফায় আলট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। পরিবারের দাবি, পরীক্ষায় তাঁর পেটের ভেতরে গজ কাপড় থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে।
দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারে বের করা হয় গজ
গত ১২ জুলাই বীথি আক্তারকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। তিন দিন পর, ১৫ জুলাই সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলুল হক শোভন ও চিকিৎসক সঞ্জয় সাহা তাঁর দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার করেন। এ সময় পেটের ভেতর থেকে গজ কাপড় বের করা হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
তাঁদের অভিযোগ, তত দিনে পেটের ভেতরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্ত্রের অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে ২২ জুলাই তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। তবে শারীরিক জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি বলে পরিবারের দাবি।
পরবর্তী সময়ে সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে গেলে ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে গত ৪ অক্টোবর তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৮ অক্টোবর সকালে তাঁর মৃত্যু হয়। ওই দিনই গ্রামের বাড়িতে নিয়ে জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়।
মামলা না করার শর্তে ৫৫ হাজার টাকা দেওয়ার দাবি
বীথি আক্তারের মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। এ-সংক্রান্ত একটি লিখিত চুক্তির তথ্যও সামনে এসেছে।
প্রকাশিত নথির তথ্য অনুযায়ী, মামলা না করার শর্তে বীথির স্বামী রাকিবুল ইসলামকে ৫৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করা ওই চুক্তিতে ভবিষ্যতে রোগীর পরিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেবে না বা আর্থিক দাবি করবে না—এমন শর্তের উল্লেখ রয়েছে। নথিতে রাকিবুল ইসলামের স্বাক্ষর দেখা গেছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর অস্পষ্ট করে প্রকাশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে রাকিবুল ইসলাম দাবি করেন, ওই সময় তাঁর কাছে মাত্র ২০ হাজার টাকা ছিল। হাসপাতালের বকেয়া বিলসহ বিভিন্ন আর্থিক চাপে পড়ে তিনি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে ৫০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। পরিবারের ভবিষ্যৎ ও তৎকালীন আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
তবে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা বক্তব্যের মাধ্যমে এখনো স্পষ্ট হয়নি।
তদন্ত কমিটি গঠন
এ বিষয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মানস কৃষ্ণ কুণ্ডু জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের টাকা দেওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত তথ্য ছড়িয়ে পড়ার কথা তিনি শুনেছেন।
তিনি বলেন, বীথি আক্তারের চিকিৎসার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
মানস কৃষ্ণ কুণ্ডু আরও জানান, বীথির চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাসকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
পরিবারের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা
বীথি আক্তারের চিকিৎসা ও মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পরিবারের সদস্যরা অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে।
তবে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের সত্যতা, অস্ত্রোপচারের সময় কী ঘটেছিল এবং আর্থিক সহায়তার বিনিময়ে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার শর্তে কোনো চুক্তি করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে তদন্তের ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই এ ঘটনায় দায়দায়িত্ব ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

