এম,এ রাশেদ,স্টাফ রিপোর্টারঃ “বিশ্ব মাদক সমস্যা: অব্যাহত সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং উদ্ভাবনী প্রতিক্রিয়া” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বগুড়ায় বর্ণাঢ্য কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
শুক্রবার (২৬ জুন ২০২৬) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় (বটতলা) প্রাঙ্গণ থেকে একটি মানববন্ধন ও মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক র্যালি বের হয়। র্যালিটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা পরিষদ মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা। বিশেষ অতিথি ছিলেন বগুড়া সিটি প্রশাসক এম. আর. ইসলাম স্বাধীন, জেলা পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ (পিপিএম) এবং সিভিল সার্জন ডা. মো. খুরশীদ আলম।
সভায় সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাসুদ হোসেন। স্বাগত বক্তব্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বগুড়া জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. জিললুর রহমান অধিদপ্তরের চলমান কার্যক্রম, সরকারের মাদকবিরোধী পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধি, বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সদস্য, প্রতিযোগিতার বিজয়ী শিক্ষার্থী এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, মাদক কেবল একজন ব্যক্তির জীবনকেই বিপর্যস্ত করে না; এটি একটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্যও বড় হুমকি। মাদকের ভয়াবহতা থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তারা মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
বক্তারা আরও বলেন, সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আলোকে মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করছে। তবে শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ নয়, প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম, পুনর্বাসন, পারিবারিক সচেতনতা এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এজন্য যুবসমাজকে খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
দিবসটি উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মাদকবিরোধী পোস্টার, স্টিকার ও লিফলেট বিতরণ, গণপরিবহনে সচেতনতামূলক স্টিকার সংযোজন, জেলা তথ্য অফিসের সহযোগিতায় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা এবং বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করা হয়।
এছাড়া জেলার ১২টি উপজেলায় ১৩টি স্থানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, ১৪টি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের উদ্যোগে শহরের ১২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিনামূল্যে কাউন্সেলিং সেবা, মাদকবিরোধী মাইকিং, র্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সরকারের মাদকবিরোধী অবস্থান বাস্তবায়নে প্রতিটি উপজেলায় বিশেষ অভিযানও জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে বগুড়ায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয় নির্মাণের জন্য এক একর জমি বরাদ্দের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানানো হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জেলায় ১ হাজার ৮০৩টি অভিযান পরিচালনা করে ৭০২টি মামলায় ৭৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব অভিযানে ৩৫০ গ্রাম হেরোইন, ৩৩১ দশমিক ৮৫৯ কেজি গাঁজা, ৪৪৪ বোতল ফেন্সিডিল, ৪৪ হাজার ৫১টি ইয়াবা, ৭ হাজার ৪০২টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট, ১৮০ দশমিক ৭০০ লিটার চোলাই মদ, ৩৫০ লিটার ওয়াশ এবং ১ হাজার ২২৫ অ্যাম্পুল বুপ্রেনরফিনসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য, নগদ অর্থ ও বিভিন্ন যানবাহন জব্দ করা হয়।
অন্যদিকে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৮৩৮টি অভিযানে ৩৩৬টি মামলায় ৩৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৪ গ্রাম হেরোইন, ৮৪ দশমিক ১৩৫ কেজি গাঁজা, ৫২ বোতল ফেন্সিডিল, ৩৮ হাজার ৭৬৭টি ইয়াবা, ২ হাজার ২৭৭টি ট্যাপেন্টাডল, ৫৩ দশমিক ৬০০ লিটার চোলাই মদ এবং ১ হাজার ৬২২ অ্যাম্পুল বুপ্রেনরফিনসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য, নগদ অর্থ ও অন্যান্য আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
অধিদপ্তর জানিয়েছে, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে উপস্থিত সবাই মাদকমুক্ত, সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ গঠনে সম্মিলিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে আগামী প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে রক্ষা করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা বলেন, “মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে কেবল প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।”

