মিন্টু ইসলাম:
বিশ্ব মৌমাছি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে শেরপুর পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ), বগুড়ায় আজ রবিবার বাংলাদেশ মৌচাষী সোসাইটির সার্বিক সহযোগিতায় “জলবায়ু সহনশীল মৌচাষ ও মৌজাত পণ্যের উপকারিতা বিষয়ক সচেতনতামূলক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ” অনুষ্ঠিত হয়েছে। “মানুষ ও মৌমাছি পৃথিবীতে একত্রে বসবাস—একটি অংশীদারিত্ব; যা আমাদের টিকিয়ে রাখে” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এ প্রশিক্ষণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৫০০ জন মৌচাষি অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জনাব মীর শাহে আলম, এমপি। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, মৌচাষ এখন আর ক্ষুদ্র পেশা নয়; এটি কৃষি, নিরাপদ খাদ্য, আমদানি বিকল্প, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের একটি কৌশলগত খাত। তিনি বলেন, “মৌমাছি রক্ষা মানে কৃষি রক্ষা, কৃষি রক্ষা মানে খা
তিনি জানান, দেশে বছরে অন্তত ৩০ হাজার টন মানসম্মত মধুর চাহিদা পূরণ ও বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে সরকার একটি প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেবে আরডিএ, বগুড়া। বগুড়াকে কেন্দ্র করে Bee Breeding and Honey Processing Plant স্থাপন, উন্নত রাণী মৌমাছি উৎপাদন, QC Lab, মধু টেস্টিং, প্যাকেজিং, স্টোরেজ ও খুচরা আউটলেট স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘মিল্কভিটা’র আদলে সমবায় সমিতি গঠনের মাধ্যমে মৌচাষিদের সংগঠিত করা হবে। একইসঙ্গে সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে Bee Flora বৃক্ষরোপণে গুরুত্বারোপ করেন তিনি, যাতে মৌমাছির জন্য সারাবছর পর্যাপ্ত নেক্টার নিশ্চিত করা যায়।
তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান মৌচাষ, নিরাপদ খাদ্য, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও রপ্তানিমুখী পল্লী শিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর নির্দেশনায় উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে আরডিএতে মৌচাষ গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বগুড়া হবে নিরাপদ মধুর রাজধানী এবং উত্তরাঞ্চল গড়ে উঠবে মৌচাষ শিল্পাঞ্চল হিসেবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আরডিএ’র উপ-পরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম। তিনি “Insight of Beekeeping in Northern Region” শীর্ষক গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে জানান, ২০২৪ সালে দেশে প্রাকৃতিক ও চাষভিত্তিক উৎস মিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টন মধু উৎপাদিত হলেও চাহিদা ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টন। ফলে দেশে এখনো ৫ থেকে ১০ হাজার টনের ঘাটতি রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, উৎপাদিত মধুর ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই এসেছে চাষভিত্তিক উৎস থেকে।
তিনি বলেন, রাণী মৌমাছির ব্রিডিং সেন্টার স্থাপন, সুপার বক্স ব্যবহার, ফুডগ্রেড কন্টেইনার, আধুনিক কীটনাশক ব্যবস্থাপনা ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে দেশে মধু উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। সুপার বক্সের সরিষা মধুর ল্যাব বিশ্লেষণে আর্দ্রতা ২০ শতাংশের নিচে এবং টিএসএস বেশি পাওয়া গেছে, যা উন্নত মানের মধুর গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাসা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ মৌচাষী সোসাইটির চেয়ারম্যান জনাব এ কে এম সিরাজুল ইসলাম এবং পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, গোপালগঞ্জের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন। তাঁরা বলেন, মৌমাছি পরাগায়নের মাধ্যমে সরিষা, সূর্যমুখী, লিচু, কালোজিরা, ধনিয়া ও বিভিন্ন ফল-ফসলের উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃষির সঙ্গে মৌচাষ যুক্ত হলে একই জমি থেকে ফসল, মধু ও পরাগায়ন সুবিধা একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব।
মূল প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন আরডিএ’র সাবেক পরিচালক ড. একে এম জাকারিয়া। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশের মধুর ক্ষেত্রে traceability, residue test, moisture control, lab certification, adulteration control এবং export-grade packaging নিশ্চিত করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে আরডিএ বগুড়ার মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) মোঃ ফেরদৌস হোসেন খান বলেন, জলবায়ু সহনশীল মৌচাষ সম্প্রসারণ, মৌমাছিবান্ধব বৃক্ষরোপণ, নিরাপদ মধু উৎপাদন এবং কৃষক-উদ্যোক্তা উন্নয়নে আরডিএ গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।
প্রশিক্ষণে আরডিএ’র পরিচালক (প্রশিক্ষণ) ও কোর্স পরিচালক মোঃ দেলোয়ার হোসেন, উত্তরবঙ্গ মৌচাষী সমিতির নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন জেলার গবেষক, উদ্যোক্তা, ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। কোর্স সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ড. মনিরুল ইসলাম ও সহকারী পরিচালক অন্তরা খাতুন।

