এম,এ রাশেদ,স্টাফ রিপোর্টারঃ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তালগাছ। পরিবেশবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে তালগাছ শুধু ফলজ সম্পদই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে বগুড়ার ধুনট উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নানা প্রজাতির বৃক্ষের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক তালবীজ রোপণ করে আসছে। এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন সময় সমাজের বিশিষ্টজন, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারাও অংশ নিয়েছেন।
উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় রোপণ করা তালবীজ ইতোমধ্যে অঙ্কুরিত হয়ে ছোট ছোট গাছে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের চান্দিয়ার গ্রাম এবং চিকাশী ইউনিয়নের ছোনপঁচা গ্রামের সড়কের দুই পাশে বেড়ে ওঠা তালগাছগুলো পরিবেশপ্রেমীদের আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু সম্প্রতি দেখা গেছে, দুর্বৃত্তরা এসব বেড়ে ওঠা তালগাছ কেটে ফেলছে কিংবা বিশেষ কৌশলে শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলছে। এতে পরিবেশপ্রেমী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্য এবং সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এসব গাছ ধ্বংসের ঘটনাকে তারা পরিবেশের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব অপরাধ বলে মনে করছেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে যেসব গাছ রোপণ করা হয়েছে, সেগুলো ধ্বংস করছে কারা? এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জানা যায়, আমরা ধুনটবাসী ফাউন্ডেশন ও রাজফুল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট-এর যৌথ উদ্যোগে প্রতিবছর তালবীজ রোপণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়ে আসছে। এ উদ্যোগে ধীরে ধীরে আরও অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যুক্ত হয়েছে এবং উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার তালবীজ রোপণ করা হয়েছে।
আমরা ধুনটবাসী ফাউন্ডেশনের সভাপতি আঁখিনূর জামান বকুল বলেন, “ধুনট উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আমরা তালবীজ রোপণ করেছি। সময়ের ব্যবধানে অনেক বীজ তালগাছে পরিণত হয়ে বেড়ে উঠছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, কে বা কারা পরিকল্পিতভাবে এসব গাছ মেরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করছে। এটি শুধু গাছের ক্ষতি নয়, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিও অন্যায়।”
বৃক্ষপ্রেমী ও রাজফুল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী, সহকারী অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম নাবিল বলেন, “দেশ, সমাজ ও মানুষের কল্যাণে দীর্ঘদিন ধরে আমরা বৃক্ষ ও তালবীজ রোপণ করে আসছি। অথচ যাদের জন্য এই উদ্যোগ, তাদেরই একটি অংশ যদি গাছ ধ্বংস করে, তাহলে এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কিছু হতে পারে না। পরিবেশ রক্ষায় শুধু সংগঠন বা প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, সাধারণ মানুষেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলেই এ ধরনের ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।”
ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উল্লাহ নিজামী বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। পরিবেশ রক্ষায় সবার সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। মানুষ সচেতন হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটার কথা নয়। প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।”
পরিবেশপ্রেমীদের মতে, একটি তালগাছ বড় হতে সময় লাগে বহু বছর। তাই অল্প সময়ের স্বার্থে এসব গাছ ধ্বংস করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিবেশগত নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। তারা দোষীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তালগাছ সংরক্ষণে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

