মিন্টু ইসলাম সম্পাদকীয়”
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে এ শিল্পের অবদান অপরিসীম। বিশেষ করে দেশের বিপুলসংখ্যক বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে এই শিল্প। পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বড় একটি অংশ নারী। তাঁদের শ্রম ও ঘামে সচল রয়েছে দেশের অর্থনীতির চাকা।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, দেশের অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখার পরও পোশাকশ্রমিকদের একটি বড় অংশকে প্রতিনিয়ত নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সময়মতো বেতন-ভাতা না পাওয়া, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, খাবার ও সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাঁদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কে কাকে দোষারোপ করবে, তা নিয়ে নানা আলোচনা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলছে। কিন্তু এই বিতর্কের বাইরে গিয়ে শ্রমিকদের বাস্তব জীবনযাত্রার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। স্বল্প শিক্ষিত, নিম্ন আয়ের এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক মানুষের কাছে পোশাকশিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। এখানে কাজ করে তাঁরা পরিবার পরিচালনা করেন এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন।
দুই দশকে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির চিত্র
গত দুই দশকে কয়েক দফায় পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
– ২০০৬ সাল: ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা।
– ২০১০ সাল: মজুরি বাড়িয়ে করা হয় ৩ হাজার টাকা।
– ২০১৩ সাল: ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় ৫ হাজার ৩০০ টাকা।
– ২০১৮ সাল: ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে করা হয় ৮ হাজার টাকা।
– ২০২৩ সাল: নতুন মজুরি কাঠামোয় সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হয় ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এটি ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়।
– ২০২৬ সাল: শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১ নভেম্বর সরকার ছয় সদস্যের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু কাগজে-কলমে মজুরি বাড়ালেই কি শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন সম্ভব? দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে বর্তমান মজুরি দিয়ে একটি পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শ্রমিকদের দাবি ও চলমান অস্থিরতা
বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের একটি বড় অংশ ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন।
১ ও ২ নভেম্বর ঢাকার মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে অনেক পোশাক কারখানার উৎপাদনও সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি কোনোভাবেই দেশের অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। কারখানা বন্ধ থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ শ্রমিকেরা। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মালিকপক্ষ, রপ্তানি কার্যক্রম, দেশের ভাবমূর্তি এবং সামগ্রিক অর্থনীতি।
সংঘাত নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চাই
আমার ব্যক্তিগত অভিমত, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্পকারখানার মালিকদের সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা এবং দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
সরকার, পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে কার্যকর আলোচনা হওয়া জরুরি। এমন একটি মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে, যাতে শ্রমিকেরা সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও টিকে থাকতে পারে।
শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ, কর্মপরিবেশের উন্নয়ন, চাকরির নিরাপত্তা এবং দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদেরও শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি তুলে ধরতে হবে। কোনো ধরনের ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা সহিংসতা সমর্থনযোগ্য নয়।
সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নিয়মিত তদারকি, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে শ্রমিক তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবেন, মালিক তাঁর প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নিরাপত্তা ও সহযোগিতা পাবেন এবং দেশের অর্থনীতি সচল থাকবে।
মনে রাখতে হবে, পোশাকশিল্প শুধু একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত।
তাই আসুন, রাজনৈতিক বিভেদ ও পারস্পরিক দোষারোপের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করি, শিল্পকারখানা রক্ষা করি এবং আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করি।
শিল্প বাঁচুক, শ্রমিক বাঁচুক, বাঁচুক বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা।
আমাদের প্রত্যাশা, একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠুক। যেখানে সংঘাত নয়, থাকবে সহমর্মিতা; বঞ্চনা নয়, থাকবে ন্যায্য অধিকার।
লেখক: মিন্টু ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক প্রাণের শহর বিডি
www.pranershohorbd.net
ইমেইল mintuislam59@gmail.com

