লেখক সাংবাদিক কালাম আজাদ
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল ও মূলনীতি অনুযায়ী, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক এবং বিরোধী দল ও মতের প্রতি সহনশীলতা দেখানো রাষ্ট্রের সব পক্ষের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের দেশে বিরোধী দলকে কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং ‘রাষ্ট্রীয় শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিহিংসামূলক মনোভাব ও কৌশলগত দমননীতি দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে বিএনপিকে হেয় করার বহুমাত্রিক প্রচেষ্টা করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে অনেকে। কিন্তু তাদের বুঝতে হবে বিএনপি দেশের সবচেয়ে জনবান্ধব ও গণমানুষের দল।
বিএনপি দেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, বীর মুক্তিযোদ্ধা জনপ্রিয় নেতা মেজর জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দল, বিএনপি আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও দূরদর্শী নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন নেতা তারেক রহমানের দল। বিভিন্নভাবে আমাদের সামনে আসা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বিগত সময়ের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপিকে হেয় করার কৌশল হাতে নিয়েছেন অনেকে। সরকারের মুখপাত্রদের কৌশলগত অভিযোগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মিডিয়া এবং কিছু সুশীল সমাজের বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্যে বিএনপির প্রতি অবিশ্বাস ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে এসব অপপ্রচারের নেপথ্যে কাজ করছে একটি সুগঠিত, বহুমাত্রিক ও জটিল কৌশল- অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক একে ‘ছায়াযুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। এটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য শুভকর নয়। ব্যর্থতার দায় বিএনপির ঘাড়ে চাপানোর কৌশল: বর্তমান সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতা স্পষ্ট-আইন শৃংখলার চরম অবনতি, অর্থনৈতিক মন্দা, ঊর্ধ্বমুখী দ্রব্যমূল্য, সীমান্ত হত্যাকান্ড, প্রশাসনিক দুর্নীতি ইত্যাদি। কিন্তু এসব সংকট ও সমস্যা সমাধানের চেয়ে বরং এসবের দায় অন্যত্র চাপানোর মাধ্যমে নিজের গন্ডি রক্ষায় ব্যস্ত সরকার ও তার সহযোগীরা। এভাবে দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রেও বিএনপির ‘অপপ্রচার’ দায়ী করা হয়।
এই কাল্পনিক শত্রু গড়ে জনগণের মনোযোগ মূল সমস্যাগুলো থেকে সরানো হয়। ফলে রাষ্ট্রীয় দিক থেকে গড়ে ওঠা সমস্যা যেমন লুকিয়ে যায়, তেমনি গণতন্ত্রেও জন্যও গভীর ঝুঁকি তৈরি হয়। অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের পেছনে আন্তর্জাতিক ছায়া: বিএনপির বিরুদ্ধে চালানো অপপ্রচার ও দমননীতি শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কূটনীতির ফল নয়, বরং এর পেছনে আন্তর্জাতিক শক্তির সুচিন্তিত নকশা কাজ করছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে প্রভাবশালী কিছু দেশ ও গোষ্ঠী এমন সরকার চায়, যারা তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করবে না এবং নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী কাজ করবে।
বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের আধিপত্যবাদী ও একতরফা স্বার্থবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিয়েছে। সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিএনপির বক্তব্য সবসময় স্পষ্ট ও দৃঢ়। এই কারণে কিছু আন্তর্জাতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বিএনপিকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাধা হিসেবে দেখে। একই সময়ে সীমান্ত হত্যা বা গুরুত্বপূর্ণ পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে সরকারের নীরবতা এবং অবহেলা জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে। সেখানে বিএনপির স্পষ্ট ও সাহসী প্রতিবাদ দেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে, যা দেশের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রতি দায়বদ্ধতার নিদর্শন। বিএনপিকে “প্রো-ইন্ডিয়ান সাজানোর বিভ্রান্তিকর কৌশল।
বর্তমানে বিএনপিকে ‘প্রো-ইন্ডিয়ান’ বা ভারতের পক্ষে অবস্থান নেওয়া একটি সাজানো অভিযোগ ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা হিসেবে চালু রয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী ভোটব্যাংককে বিভ্রান্ত করে বিকল্প দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে ভোট বণ্টনের চেষ্টা। তবে বাস্তবতা হলো, বিএনপি কখনো ভারতের অনুগত বা প্রভাবিত দল নয়। বরং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে বিএনপি সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েছে। বাংলাদেশের স্বার্থ-সংক্রান্তকোনো বিষয় যেমন সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন বা বাণিজ্য ইস্যুতে বিএনপির অবস্থান সবসময় কঠোর ও দেশপ্রেমিক। অপরদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে নীরবতা বা অস্পষ্ট অবস্থান দেশের জনগণের মাঝে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। ফলে বিএনপিকে ‘প্রো-ইন্ডিয়ান’ রঙ দেওয়ার চেষ্টা মূলত একটি বিভ্রান্তিমূলক কৌশল, যা জনগণের রাজনৈতিক বোধকে মিথ্যা পথে পরিচালিত করছে এবং ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদী কণ্ঠরোধের একটি অংশ। সেনাবাহিনী ও জাতীয় নিরাপত্তায় আসা বিপজ্জনক হুমকি।
বর্তমান সময়ে সেনাবাহিনীকে নিয়েও প্রচন্ড অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে সেনাবাহিনীকে ‘অরাজনৈতিক’, ‘নিরপেক্ষতা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত’ কিংবা ‘অতীতের বাঁধাধরা’ হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে বাহিনীর মনোবল কমানোর চেষ্টা হচ্ছে। এই অপপ্রচারের পেছনে মূল লক্ষ্য সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে আনা, যা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক গভীর হুমকি। রাষ্ট্রের প্রধান নিরাপত্তা কাঠামোকে এভাবে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণায় জড়ানো দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত।
এ পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করে এবং দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় স্বার্থ ক্ষুন্ন করে। বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়: এটি একটি আদর্শ, একটি জনগণের বিশ্বাস ও জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারক। বারবার দমন ও নিপীড়নের মধ্যেও বিএনপি পুনরায় শক্তিশালী হয়েছে কারণ এই দলের মূল ভিত্তি হলো জনতার হৃদয়ে থাকা জাতির সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি অটল ভালোবাসা। মামলা, হেনস্তা, গুজব কিংবা রাজনৈতিক বাধার মুখে দাঁড়িয়ে এই আদর্শকে শেষ করা সম্ভব নয়। আজকের জনগণ অনেক বেশি সচেতন, দায়িত্বশীল এবং দেশপ্রেমিক। তারা বুঝতে পেরেছে কারা প্রকৃত গণতন্ত্রের পক্ষে এবং কারা দেশের স্বার্থে আপসহীন। তাই বিএনপিকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে যারা, তারা ইতিহাসের কঠিন মূল্যায়নের মুখোমুখি হবে।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে যে বিভ্রান্তিকর ও বিভাজনমূলক অপপ্রচারে ছড়াছড়ি তা শুধু বিএনপির বিরুদ্ধে নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং সুশাসনের বিরুদ্ধে। জাতীয়তাবাদী শক্তিকে সুসংগঠিত করতে হবে, জনগণকে সচেতন করতে হবে যেন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, রাজনৈতিক ভারতীয় প্রভাব এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা যায়। এই লড়াই কেবল নির্বাচনের জন্য নয়, এটি দেশের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও ভবিষ্যতের জন্য একটি জরুরি সংগ্রাম। দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জাতীয় স্বার্থের রক্ষায় সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। এখানে কাউকে দোষারোপ নয় সবাইকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে অনেক বহুদূরে। এর জন্য দরকার গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত একটি সরকার।
লেখক: কালাম আজাদ
সাধারণ সম্পাদক, বগুড়া প্রেসক্লাব।

