বাসুদেব কুমার দাস:
শরতের নীল আকাশ, শুভ্র মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোলা, শিউলির আকুল সুবাস আর ঢাকের কাঠি—সব মিলিয়ে বাঙালির হৃদয়ে বাজে শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী সুর। দেবী দুর্গার আগমন কেবল এক ধর্মীয় উৎসবের মাহেন্দ্রক্ষণ নয়; এ যেন অন্যায়ের বিনাশ, শুভশক্তির জাগরণ, সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা এবং প্রীতি-সৌহার্দ্যের বন্ধনকে গাঢ় করার এক মহতী বার্তা। বগুড়া জেলার প্রাচীন ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ জনপদ শেরপুরেও এই উৎসব ছড়িয়ে দেয় সম্প্রীতি ও সর্বজনীন আনন্দের অনন্য আলো।
শেরপুরের মাটি বহু কাল ধরে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও পারস্পরিক সহমর্মিতার সাক্ষী। এ মাটির মানুষের নাড়ির টানে মিশে আছে সামাজিক মেলবন্ধন ও লোকজ ঐতিহ্য। পূজা এলে তাই মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয় প্রতিমা নির্মাণের নান্দনিক শৈলী, মণ্ডপসজ্জা ও আলোকচ্ছটা। কারিগরের দরদি তুলির আঁচড় থেকে শুরু করে তরুণদের স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ—সবকিছুতেই প্রাণ পায় এক উৎসবমুখর আবহ। পূজার দিনগুলোতে বয়সের সীমানা পেরিয়ে সবাই মিলে রচনা করে এক আনন্দের মহাসমুদ্র।
দুর্গোৎসবের আসল সৌন্দর্য শুধুই বর্ণিল অলঙ্করণ কিংবা আড়ম্বরে নয়; এর গভীরে ফল্গুধারার মতো বয়ে চলে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও মহামিলনের দর্শন। মণ্ডপে মণ্ডপে চেনা-অচেনা মানুষের মিলনমেলা, স্বজনদের পুনর্মিলনী, প্রতিবেশীর কুশলবিনিময় আর সব ধর্মের মানুষের অকুণ্ঠ অংশগ্রহণ এই উৎসবকে দিয়েছে সর্বজনীন এক রূপ। “ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও সামাজিক মূল্যবোধ সবার”—এই অন্তর্নিহিত সত্যই শেরপুরের দুর্গোৎসবের প্রাণস্পন্দন।
আমাদের সংবিধান প্রতিটি নাগরিকের ধর্মপালন, নিজ সংস্কৃতির চর্চা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার নিশ্চিত করেছে। সেই চেতনার দীপ্ত প্রতিফলন ঘটুক শেরপুরের প্রতিটি পূজামণ্ডপে এবং প্রতিটি হৃদয়ে। ধর্মীয় ভিন্নতা যেন কখনো দূরত্ব বা বৈষম্যের দেওয়াল না গড়ে তোলে; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠুক এক নিরাপদ, নিরাপদ ও সম্প্রীতিময় সমাজব্যবস্থা।
উৎসবের আনন্দকে নিরবচ্ছিন্ন ও অর্থবহ রাখতে দায়িত্বশীলতারও বিকল্প নেই। পূজামণ্ডপ ও বিসর্জনের স্থানগুলোতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, সুশৃঙ্খল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা এবং নারী, শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পূজা উদ্যাপন কমিটি, জনপ্রতিনিধি ও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রয়াসেই তৈরি হতে পারে নিখুঁত নিরাপত্তা বলয়। একইসঙ্গে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যে কান না দিয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস বজায় রাখা নাগরিক হিসেবে আমাদের পরম দায়িত্ব।
দেবী দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপ আমাদের চিরন্তন এক শিক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করায়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম কখনোই পরাস্ত হয় না। সমাজ থেকে হিংসা, ঘৃণা, দুর্নীতি, কুসংস্কার ও বৈষম্যের অসুরি শক্তিকে উপড়ে ফেলার অঙ্গীকারই হলো পূজার আসল সার্থকতা। উৎসব তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আনন্দের আলো আছড়ে পড়ে সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের জীবনেও; যখন দুঃখীর মুখে হাসি ফোটানো আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়।
ঐতিহ্যবাহী শেরপুরে শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে উঠুক কৃষ্টি রক্ষা, সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক সমুজ্জ্বল উদাহরণ। পূজা কমিটি ও সমাজপতিদের প্রতি আহ্বান—আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি মানবিক উদ্যোগ, পরিবেশবান্ধব আয়োজন এবং তরুণ সমাজকে সুস্থ সংস্কৃতিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করার কাজেও তারা যেন অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
শারদীয় এই শুভ তিথিতে বগুড়ার শেরপুরসহ সারাদেশের সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীর প্রতি রইল প্রীতি, শুভেচ্ছা ও শুভকামনা। মহামায়ার আগমনী বার্তা প্রতিটি গৃহে বয়ে আনুক শান্তি, সমৃদ্ধি ও অনাবিল আনন্দ। অশুভের নাশ ও শুভশক্তির জয়ে আমাদের সমাজ হয়ে উঠুক আরও সুন্দর, সহনশীল ও মানবিক।
শুভ শারদীয়া! সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের বন্ধনে দীপ্ত হোক বগুড়ার শেরপুর।
বাসুদেব কুমার দাস
বি. এস.এস( অনার্স) এম.এস.এস
এলএল. বি(পার্ট-||)
উপজেলা প্রতিনিধি, দৈনিক দেশের ডাক ও স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক প্রাণের শহর বিডি অনলাইন নিউজ মিডিয়া।

