এম.এ রাশেদ,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টারঃ
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অপসাংবাদিকতার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। সাংবাদিকতার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পেশার পরিচয় ব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যক্তি সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, হয়রানি এবং অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত, পেশাদার ও নীতিনিষ্ঠ সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
সাংবাদিকতা মূলত সত্য অনুসন্ধান, জনস্বার্থ রক্ষা, অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরা এবং সমাজের কাছে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অথচ এই মহান পেশার পরিচয়কে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা শুধু সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থী নয়, বরং স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের জন্যও উদ্বেগজনক।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় কিছু ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কিংবা স্বল্পপরিচিত সংবাদমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তাঁদের কেউ জেলা প্রতিনিধি, কেউ স্টাফ রিপোর্টার, কেউ ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি, আবার কেউ ক্রাইম রিপোর্টার বা নিজস্ব প্রতিবেদক পরিচয়ে বিভিন্ন স্থানে চলাফেরা করছেন।
সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র, ভিজিটিং কার্ড, ক্যামেরা কিংবা সংবাদমাধ্যমের লোগো থাকলেই একজন ব্যক্তি পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন না। একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ খুলে সংবাদ প্রকাশ শুরু করা সম্ভব হলেও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা পরিচালনার জন্য প্রয়োজন তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা, পেশাগত সততা, নৈতিকতা এবং জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার ও শিক্ষাগত যোগ্যতা।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে সহজেই সংবাদমাধ্যমের আদলে লোগো, ব্যানার ও প্রচারসামগ্রী তৈরি করা যায়। ফলে এসব উপকরণের বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে কারও পেশাগত পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমের পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিয়োগের সত্যতা যাচাইয়ের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে কিছু ব্যক্তির পেশাগত কার্যক্রম, আয়ের উৎস এবং সাংবাদিকতার সঙ্গে তাঁদের প্রকৃত সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির পরিবর্তে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁদের কারও বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি কিংবা অর্থনৈতিক সুবিধা চাওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তবে কারও আর্থিক অবস্থা, নিয়মিত চাকরি না থাকা, জীবিকার ধরন কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে তাঁকে অপসাংবাদিক হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। সাংবাদিকতার প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর কাজের মান, তথ্যের নির্ভুলতা, পেশাগত আচরণ, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং জনস্বার্থে অবদানের ভিত্তিতে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে যাচাই করে প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
গ্রামাঞ্চলের সহজ-সরল মানুষ অনেক সময় প্রকৃত সাংবাদিক ও ভুয়া পরিচয়ধারীদের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন না। এ সুযোগে কেউ কেউ সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অফিস-আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাজার কিংবা জনবহুল এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়ে কাউকে অযৌক্তিকভাবে ভয় দেখানো, সংবাদ প্রকাশের হুমকি দিয়ে অর্থ দাবি করা, ব্যক্তিগত বিরোধকে সংবাদ প্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কিংবা কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
একজন প্রকৃত সাংবাদিকের শক্তি তাঁর পরিচয়পত্র কিংবা পদবিতে নয়; তাঁর শক্তি সত্যনিষ্ঠ সংবাদ, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং মানুষের আস্থায়। যে ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন, তাঁর কর্মকাণ্ডের দায় কোনোভাবেই পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপানো উচিত নয়।
অপসাংবাদিকতা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অন্য সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন যথাযথ সূত্র উল্লেখ না করে বা প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি ছাড়া পুনঃপ্রকাশের অভিযোগও রয়েছে। একটি সংবাদ তৈরির পেছনে সংবাদকর্মীর সময়, শ্রম, অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই এবং পেশাগত দক্ষতা জড়িত থাকে। সেই প্রতিবেদন যথাযথ স্বীকৃতি ছাড়া ব্যবহার করা হলে মূল প্রতিবেদকের কাজের স্বীকৃতি ও সংবাদমাধ্যমের পেশাগত স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংবাদ সংগ্রহের পরিবর্তে অন্যের প্রতিবেদন অনুকরণ করে নিজেদের সংবাদমাধ্যমের পরিচিতি বাড়ানোর প্রবণতা সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে সহায়ক নয়। বরং নিজস্ব অনুসন্ধান, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোকেও নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, পরিচয়পত্র প্রদানের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, নিয়মিত পেশাগত মূল্যায়ন এবং পরিচয়পত্রের অপব্যবহার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদের জন্য নৈতিকতা, তথ্য যাচাই, সংবাদ সংগ্রহের পদ্ধতি এবং আইনগত দায়বদ্ধতা সম্পর্কে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো উচিত। কোনো প্রতিনিধির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের উচিত বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া।
সাধারণ মানুষেরও সচেতন থাকা জরুরি। কেউ সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে অর্থ দাবি করলে, ভয়ভীতি প্রদর্শন করলে কিংবা সংবাদ প্রকাশের হুমকি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করলে তাঁর পরিচয় সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাচাই করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ঘটনার প্রমাণ সংরক্ষণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া উচিত।
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের পেশা নয়; এটি জনগণের অধিকার, সত্য প্রকাশ এবং রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অন্যতম মাধ্যম। এই পেশার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। একইভাবে, বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযোগের কারণে সব সাংবাদিককে একই দৃষ্টিতে দেখাও অনুচিত।
অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, পেশাগত নৈতিকতার চর্চা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে হেয় করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি সাংবাদিকতার পরিচয়ের আড়ালে সংঘটিত কোনো অনিয়মকেও উপেক্ষা করা যায় না।
প্রকৃত ও সৎ সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষা এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট রাখতে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম, সাংবাদিক সংগঠন, প্রশাসন ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠিত হলেই অপসাংবাদিকতার অপচর্চা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে এবং গণমাধ্যম তার প্রকৃত সামাজিক দায়িত্ব পালনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

