এম.এ রাশেদ,স্টাফ রিপোর্টারঃ শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এ বছর উপজেলার ২৮টি মন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। পূজাকে ঘিরে প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপের সাজসজ্জা, নতুন পোশাক কেনাকাটা ও অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
পূজার দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই ব্যস্ততা বাড়ছে প্রতিমা কারিগরদের। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাটি, খড়, বাঁশ ও কাঠ নিয়ে নিরলস কাজ করছেন সারিয়াকান্দির প্রতিমা কারিগর নয়ন রাজভর (৩৯)। প্রতিমা তৈরি করেই চলে তাঁর সংসার। তিনি পৌর এলাকার সারিয়াকান্দি বাজারের রঞ্জন রাজভরের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই প্রতিমা তৈরির কাজে যুক্ত নয়ন।
এবার উপজেলার পৌর এলাকার শ্রী শ্রী যুগল কিশোর মন্দিরে বসেই ছয় সেট দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ করছেন তিনি। কাকডাকা ভোরে শুরু হয় তাঁর কর্মযজ্ঞ। দিনভর চলে কাঠামো তৈরি, খড় বাঁধা, মাটির প্রলেপ দেওয়া ও প্রতিমার অবয়ব ফুটিয়ে তোলার কাজ।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিমার মাটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন চলছে খুঁটিনাটি কাজ। মাটির কাজ শেষ হলেই রং ও তুলির আঁচড়ে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমায় ফুটে উঠবে পূর্ণাঙ্গ রূপ। এরপর অলংকার ও সাজসজ্জার কাজ শেষে প্রতিমাগুলো তুলে দেওয়া হবে সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের হাতে।
প্রতিমা কারিগর নয়ন রাজভর বলেন, গত বছর তিনি আট সেট দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করেছিলেন। সবগুলো বিক্রি করে ভালো লাভ হয়েছিল। সেই অর্থ দিয়েই সারা বছর সংসারের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হয়েছে। এবার ছয় সেট প্রতিমা তৈরির অর্ডার পেয়েছেন।
তিনি জানান, প্রতিটি প্রতিমা সেট তৈরিতে কাঠ, বাঁশ, খড় ও মাটি বাবদ প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতিটি সেট ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। তবে প্রতিমা তৈরির সঙ্গে আরেকটি দুশ্চিন্তাও রয়েছে। প্রতিমা ভাঙচুরের আশঙ্কায় অনেক সময় রাত জেগে পাহারা দিতে হয় বলেও জানান তিনি।
উপজেলা সূত্রে জানা গেছে, গত বছর সারিয়াকান্দিতে ২৪টি মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবার চারটি মন্দির বেড়ে মোট ২৮টি মন্দিরে পূজার আয়োজন করা হচ্ছে। এর মধ্যে পৌর এলাকায় পাঁচটি, ফুলবাড়ী ইউনিয়নে সাতটি, নারচী ইউনিয়নে তিনটি, কুতুবপুর ইউনিয়নে তিনটি, কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নে দুটি, কামালপুর ইউনিয়নে তিনটি, চন্দনবাইশা ইউনিয়নে একটি, হাটশেরপুর ইউনিয়নে তিনটি এবং চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নে একটি মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
শুধু পূজামণ্ডপ নয়, উৎসবের প্রস্তুতি চলছে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরেও। পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক কেনা, অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন, ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। মোয়া, মুড়ি, মুড়কি থেকে শুরু করে নানা ধরনের মিষ্টি-মিঠাই তৈরির ধুম পড়েছে। গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্রই যেন বেজে উঠেছে শারদীয় উৎসবের আগমনী সুর।
পৌর এলাকার বাসিন্দা বাবু অরুণাংশু কুমার সাহা বলেন, দুর্গাপূজার প্রস্তুতিকে ঘিরে হিন্দু পাড়াগুলোতে এখন উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। সবাই আনন্দের সঙ্গে পূজার অপেক্ষা করছেন। এ বছর দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আগমন করবেন এবং নৌকায় চড়ে কৈলাসে ফিরে যাবেন। পূজার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষের সুখ, শান্তি ও মঙ্গল কামনা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, উৎসবের আনন্দ নির্বিঘ্ন রাখতে প্রতিটি পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারি প্রত্যাশা করেন তিনি।
সারিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ ফ ম আসাদুজ্জামান বলেন, উপজেলায় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা নেই। শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ, নির্বিঘ্ন ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, প্রতিটি পূজামণ্ডপে আনসার সদস্যের পাশাপাশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি পুলিশের জরুরি টহল দল সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন, পুলিশ ও পূজা উদ্যাপন কমিটির সমন্বিত উদ্যোগে সারিয়াকান্দিতে এবারও শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসব হয়ে উঠবে সবার মিলনমেলা – এমন প্রত্যাশাই এখন স্থানীয়দের।

