দৈনিক প্রাণের শহর বিডি ডেস্ক:
সময়মতো নামাজ আদায়, মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ ও আল্লাহর পথে সংগ্রাম—হাদিসে উল্লেখিত তিনটি আমলের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী।
ইসলামে এমন কিছু নেক আমল রয়েছে, যেগুলো মহান আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এসব আমলের গুরুত্ব ও ফজিলত বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে সময়মতো নামাজ আদায়, মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ এবং আল্লাহর পথে সংগ্রাম অন্যতম।
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, তিনি একদিন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি?’
জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সময়মতো নামাজ আদায় করা।’
এরপর তিনি জানতে চাইলে নবীজি (সা.) বলেন, ‘মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করা।’ তৃতীয়বার জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর পথে সংগ্রাম করা।’
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এ হাদিসে বর্ণিত তিনটি আমল একজন মুমিনের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত এসব আমলের গুরুত্ব উপলব্ধি করে বাস্তব জীবনে তা অনুসরণ করা।
সময়মতো নামাজ আদায়
নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ঈমানের পর নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন স্থানে নামাজ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একজন মুমিনের সফলতা ও পরকালীন মুক্তির অন্যতম মাধ্যম হলো একনিষ্ঠতা, বিনয় ও আন্তরিকতার সঙ্গে নামাজ আদায় করা।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়ী।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত ১-২)।
নামাজ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; বরং এটি মানুষের আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত নামাজ আদায় করা।
মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বর্ণিত দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করা। ইসলামে পিতা-মাতার অধিকার অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, সেবা করা, ভালো ব্যবহার করা এবং তাঁদের মনে কষ্ট না দেওয়া সন্তানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাঁদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের উহ্ শব্দটিও বলো না এবং তাঁদের ধমক দিয়ো না; বরং তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ২৩)।
ইসলামি শিক্ষায় মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্বশীল আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা, সাধ্যমতো সেবা করা এবং তাঁদের জন্য দোয়া করা প্রত্যেক সন্তানের কর্তব্য।
আল্লাহর পথে সংগ্রাম
হাদিসে বর্ণিত তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো আল্লাহর পথে সংগ্রাম করা। আরবি ‘জিহাদ’ শব্দের অর্থ হলো প্রচেষ্টা, সাধনা ও সংগ্রাম। ইসলামের পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ন্যায় ও কল্যাণের পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো এর অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহর পথে সংগ্রামের মধ্যে নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই, অন্যায়ের প্রতিবাদ, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া, মানুষের কাছে ইসলামের সঠিক শিক্ষা তুলে ধরা এবং কল্যাণকর কাজে আত্মনিয়োগ করার বিষয়গুলো রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে ইসলামের নৈতিক শিক্ষা, শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণের আদর্শ অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।
তিন আমলেই রয়েছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বর্ণিত এ হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, একজন মুসলমানের জীবনে ব্যক্তিগত ইবাদত, পারিবারিক দায়িত্ব এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কল্যাণকর প্রচেষ্টা—সবকিছুরই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সময়মতো নামাজ আদায় করা, মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ন্যায় ও কল্যাণের পথে কাজ করে যাওয়া।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এসব নেক আমল যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।
সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট।
সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট।
সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।

