এম এ রাশেদ,স্টাফ রিপোর্টার
এক হাতে ক্যামেরা, অন্য হাতে গাছের চারা-দুটি পরিচয় নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করে চলেছেন ফটোসাংবাদিক এস এম আরিফুল আমিন প্লাবন। পেশাগত দায়িত্বে মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও সংকটের ছবি ধারণের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রাণীকল্যাণ ও মানবিক সহায়তার নানা কর্মকাণ্ডে সক্রিয় তিনি।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে মানুষের জীবনযাপন, দুঃখ-কষ্ট, দুর্যোগ ও সম্ভাবনার চিত্র ক্যামেরায় তুলে ধরেছেন আরিফুল আমিন। তাঁর কাছে ফটোসাংবাদিকতা শুধু ছবি তোলার পেশা নয়; মানুষের বাস্তবতা তুলে ধরে সচেতনতা সৃষ্টি এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। সেই ভাবনা থেকেই পেশার বাইরে স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন তিনি।
করোনাকালে মানুষের পাশে
২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে যখন মানুষের স্বাভাবিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন বগুড়ার ধুনট উপজেলায় করোনা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন আরিফুল আমিন। আক্রান্ত রোগীদের উদ্ধার, তাঁদের পরিবারের কাছে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছে দেওয়া এবং সংকটময় সময়ে অক্সিজেন সরবরাহের মতো কাজে অংশ নেন তিনি।
লকডাউন বাস্তবায়নে প্রশাসনকে সহযোগিতা, বিভিন্ন এলাকায় জীবাণুনাশক ছিটানো, মাস্ক, পিপিই ও স্যানিটাইজার বিতরণ এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতেও কাজ করেছেন। করোনাসহ বিভিন্ন কারণে মৃত্যুবরণকারীদের দাফন এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার কাজেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন তিনি।
আরিফুল আমিন বলেন, “দুর্যোগ কিংবা সংকটের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় পরিচয়। সেখানে ধর্ম, বর্ণ কিংবা পরিচয়ের বিভাজন থাকার কোনো সুযোগ নেই।”
সহায়তার পাশাপাশি স্বাবলম্বিতার উদ্যোগ
ধুনট উপজেলার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজেও যুক্ত রয়েছেন আরিফুল আমিন। ‘স্বপ্নসেবা’ সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক হিসেবে তিনি বিভিন্ন সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় ভূমিকা রাখছেন।
ঈদসহ বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পোশাক ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাবলম্বিতার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংগঠনের উদ্যোগে কারও হাতে গরু, আবার কারও হাতে ছাগল তুলে দেওয়ার মতো কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁরা ভবিষ্যতে নিজেরাই আয় করতে পারেন।
আরিফুল আমিন বলেন, “কাউকে একবার সাহায্য করার চেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া বেশি কার্যকর। এতে সহায়তাপ্রাপ্ত মানুষটি দীর্ঘমেয়াদে নিজের ও পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারেন।”
এক দশক ধরে বৃক্ষরোপণ
পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হেল্প দ্যা নেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা আরিফুল আমিন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বৃক্ষরোপণ, দেশীয় প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারে কাজ করছেন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে হাজার হাজার দেশীয় ফলজ ও বনজ গাছ লাগিয়েছেন তিনি। বিশেষ গুরুত্ব দেন তালবীজ সংগ্রহ ও রোপণে। তাঁর উদ্যোগে লাগানো বেশ কিছু তালগাছ ইতোমধ্যে বড় হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি বিলুপ্তপ্রায় করঞ্জা গাছের ৫০০টি বীজ সংগ্রহ করেছেন তিনি। এসব বীজ থেকে চারা উৎপাদনের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
নদীভাঙন ও বন্যাপ্রবণ এলাকার বাসিন্দা হিসেবে শৈশব থেকেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও প্রকৃতির নানা রূপ দেখেছেন আরিফুল আমিন। ফলে চরাঞ্চল, নদীভাঙনকবলিত এলাকা এবং দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে বৃক্ষরোপণকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
কাজের প্রয়োজনে দেশের যে প্রান্তেই যান, সুযোগ পেলেই সঙ্গে রাখেন গাছের চারা কিংবা বীজ। উপযুক্ত জায়গা পেলেই সেখানে তা রোপণ করে দেন। তাঁর কাছে ভ্রমণের পথও যেন হয়ে ওঠে নতুন সবুজের সম্ভাবনা তৈরির সুযোগ।
বীজে গ্রামীণ নারীর স্বাবলম্বিতা
পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগেও যুক্ত রয়েছেন আরিফুল আমিন। তাঁর মায়ের উৎপাদিত দেশীয় বিভিন্ন সবজির বীজ বিনা মূল্যে গ্রামের নারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
এসব বীজ থেকে উৎপাদিত সবজি পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি উৎপাদন বাজারে বিক্রি করে নারীদের আয় করার সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে দেশীয় কৃষিবীজ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারেও এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখছে।
বন্যপ্রাণী রক্ষায়ও সক্রিয়
মানুষ ও প্রকৃতির পাশাপাশি বন্যপ্রাণী রক্ষার কাজেও যুক্ত আছেন আরিফুল আমিন। বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন সময়ে বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নেন তিনি।
নগর পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগেও নিয়মিত দেখা যায় তাঁকে। প্রতি শুক্রবার ভোরে ‘৫৫ কদমতলা’ সংগঠনের সঙ্গে গুলশান-বনানী লেক এলাকায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। তাঁর মতে, নগরের সবুজায়ন কেবল কোনো সংগঠনের কর্মসূচি নয়, বরং প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্বের অংশ।
মেয়েকে নিয়ে ‘কার্বন নিউট্রাল বেবি’ উদ্যোগ
পরিবেশ নিয়ে আরিফুল আমিনের ভাবনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক তাঁর মেয়েকে ঘিরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। চলতি বছর কন্যাসন্তানের জন্মের পর এক মাস বয়স থেকেই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেন তিনি।
প্রতি মাসে অন্তত ১০০টি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৬০০টি গাছ রোপণের লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছেছেন তিনি।
মেয়েকে ‘কার্বন নিউট্রাল বেবি’ হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি শৈশব থেকেই প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। তাঁর কাছে এটি শুধু পারিবারিক উদ্যোগ নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের সঙ্গে পরিচিত করার একটি প্রতীকী প্রয়াস।
ছুটির দিনেও থামে না স্বেচ্ছাসেবা
কর্মসূত্রে বর্তমানে ঢাকায় থাকলেও ছুটির সুযোগ পেলেই জন্মস্থান বগুড়ার ধুনটে ফিরে যান আরিফুল আমিন। সেখানে স্থানীয় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। কোনো সপ্তাহে ধুনটে যেতে না পারলে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত থাকেন।
ফটোসাংবাদিক হিসেবে ক্যামেরার লেন্সে মানুষের জীবন ও সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরেন তিনি। আবার স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সেই বাস্তবতার সংকট মোকাবিলায় নিজেই মাঠে নামেন। পেশা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র ভিন্ন হলেও তাঁর লক্ষ্য অভিন্ন—মানুষ, প্রকৃতি ও প্রাণীর কল্যাণে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ভূমিকা রাখা।
আরিফুল আমিন মনে করেন, সমাজ কিংবা পরিবেশে পরিবর্তন আনতে সব সময় বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে নিয়মিত ও আন্তরিকভাবে ছোট ছোট উদ্যোগ নিলে সেগুলোর সম্মিলিত প্রভাব একসময় বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তাঁর এক হাতে ক্যামেরা আর অন্য হাতে চারা—এই দুই প্রতীকই যেন সেই প্রত্যয়ের কথা বলে।

